17/09/2024
ইন্ডিয়া গতবছর আমাদের কাছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিক্রি করেছে অপরদিকে মাত্র ২ বিলিয়ন কিনেছে। তারা যা কিনছে সেগুলোর অলটারনেটিভ কোন কান্ট্রি না থাকায় আমাদের থেকে নিচ্ছে এবং আরেক ধরণের পণ্য নিচ্ছে যেগুলোর গ্লোবাল মার্কেট ভ্যালু সম্পর্কে আমাদের আইডিয়া নেই, যেমন লাউভোলা মাছ, সাতক্ষীরা অঞ্চলে পাওয়া যায়, এই মাছের ফুলকা দিয়ে দামী প্রসাধনী তৈরি হয়। ইন্ডিয়ানরা এই মাছ বাংলাদেশ থেকে নিয়ে প্রসেস করে আমেরিকায় বিক্রি করছে, আবার কিছু মাছের পটকা, তেল, আইশ তারা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে প্রসেস করে বিভিন্ন দেশে বিক্রি করছে, কিছু মাছের চামড়া নিয়ে তারা ইকো লেদার তৈরি করে পুরো বিশ্বে বাজিমাত করছে। এতো শুধু মাছের কথা কথা বললাম, এছাড়াও ঠিক এভাবেই প্রত্যেকটা সেক্টরে ইন্ডিয়ানরা বাংলাদেশ থেকে সস্তায় সোর্স করছে।
আমরা ইন্ডিয়া থেকে যেসব পণ্য কিনছি সেগুলো প্রায় অর্ধেক মূল্যে আফ্রিকা থেকে ইমপোর্ট করা সম্ভব, শুধু সোর্স না জানার কারনে মাঝখানে ইন্ডিয়া বিজনেস করছে। তারমধ্যে কিছু কিছু পণ্য ইন্ডিয়ান ব্যাবসায়ীরা বিভিন্ন দেশ থেকে ইমপোর্ট করে আবার দ্বিগুণ মূল্যে আমাদের কাছে বিক্রি করছে।
দুঃখের বিষয় হলো আমাদের সম্পূর্ণ সক্ষমতা থাকা সত্বেও এই পণ্যগুলো ইন্ডিয়া সহ আশেপাশের দেশগুলো থেকে কিনছি। যেমন টমেটো সস, টমেটো পাওডার, নারিকেলের গুড়া, বিস্কুট, কলম, খাতা, পেনসিল, টুথপেষ্ট, সিমেন্ট, সাবান ইত্যাদি৷ এসব পণ্য বিলিয়ন ডলার ইমপোর্ট করার কোন লজিক নাই, এই লিস্টটা অনেক বড়ো যে লিখে শেষ করার মত না। এই প্রোডাক্টগুলো টেস্টেড না, অধিকাংশ খাবারেই হেভি মেটাল পাওয়া যায়, আর এক্সটার্নাল ব্যাবহারের পণ্যগুলোতে অধিক মাত্রায় ক্যামিকেল থাকছে তবে তাদের সব পণ্যতে না শুধু বাংলাদেশে যেগুলো পাঠাচ্ছে সেগুলোতেই, অন্যান্য দেশে যেগুলো পাঠাচ্ছে সেগুলো যথেষ্ট কোয়ালিটিফুল অথচ সেম ব্র্যান্ড।
আমাদের তরুণদের মাথায় ইমপোর্ট কেন্দ্রিক বিজনেস প্ল্যান গ্রো করানোর জন্য ইন্ডিয়া সহ আশেপাশের কিছু কান্ট্রি বড় রকমের ইনভেস্টমেন্ট করে যাচ্ছে রেগুলার ৷ কিছু ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট, ইনফ্লুয়েন্সার,ব্যাংক সহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে আর তরুণ উদ্যোক্তারা ঝাপিয়ে পড়ছে। অথচ তাদের দেশের তরুণদেরকে তারা এক্সপোর্ট কেন্দ্রিক প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট এবং মার্কেটিংয়ে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা সহ উৎসাহ দিচ্ছে।
আমাদের পলিসি মেকারদের এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই, কারণ এ বিষয়ে কথা বললে তাদের কমিশন বন্ধ হয়ে যাবে।
২০২০ সালের পর থেকে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্লাসগুলোতে এই বিষয় নিয়েই কথা বলে যাচ্ছি, উদ্যোক্তাদের অনেক রেসপন্স পাচ্ছি, আমাদের দরকার লক্ষ লক্ষ ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের লক্ষ লক্ষ প্রোডাক্ট, চাইনিজ উদ্যোক্তাদেরকে আমরা ফলো করতে পারি। চাইনিজ উদ্যোক্তা "জিউ" প্রতি বছর মূলার পাউডার গ্লোবালি সেল করছে বাংলা টাকায় প্রায় ৬ কোটি টাকা, অথচ আমরা কাজ করার মত পণ্য খুঁজে পাই না, গ্লোবাল মার্কেট ভ্যালু হিসেবে আমরা প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলারের মূলা নষ্ট করছি। আমরা দলে দলে চায়নাতে যাচ্ছি চায়না থেকে বাংলাদেশে এনে কি কি বিক্রি করা যায় এগুলো খোঁজার জন্য অথচ এটা শিখার জন্য যাওয়া উচিৎ ছিল যে কিভাবে চাইনিজরা তাদের পন্য গ্লোবালি সেল করছে।
আমাদের গ্লোবাল মার্কেটে সেল করার মত লক্ষ লক্ষ পণ্য রয়েছে, আমপাতা জামপাতা তেঁতুলের বিচি, কচুরিপানা, পুকুরের শেওলাসহ কয়েক লক্ষ পণ্য নিয়মিত নষ্ট হচ্ছে।
আমাদের গ্রামের বাচ্চারা কটকটি ওয়ালার কাছে তেঁতুলের বিচি, হাসের পাখা বিক্রি করে বিনিময়ে ২ টাকার আচার পেয়েই অনেক খুশি, সেগুলো ভাঙ্গরি ব্যাবসায়ীদের মাধ্যমে ঢাকায় এনে নামমাত্র মূল্যে আশেপাশের দেশগুলোতে বিক্রি করে কিছু রফতানি সাবসিডি পেয়ে আমরা মহাখুশি, এর পরে আর খোঁজ রাখি না অথবা আমাদেরকে রাখতে দেওয়া হয় না। তারা তেঁতুলের বিচি দিয়ে মেডিসিন, তেল সহ ১০-১২ রকমের পণ্যে এটি ব্যবহার করে গ্লোবালি সেল করছে এমনকি আামাদের দেশেও সেল করছে, হায়রে বোকা জাতি আমরা, এগুলো আমরা অনেক দামে কিনে ব্যাবহার করছি আবার গর্ব করে আশেপাশের মানুষদের সাথেও গল্প করছি, অথচ প্রত্যন্ত গ্রামের সেই বাচ্চাটির পরিবারের সারা বছরের ভরনপোষণ সেই ৫০০ গ্রাম তেতুলের বিচি দিয়েই করা সম্ভব হতো। তেঁতুলের বিচি মাত্র একটা পণ্য, ঠিক এরকম আরো লক্ষাধিক পণ্য ডেভেলপ করার সুযোগ রযেছে আমাদের গ্রামগুলোতে।
গোটা বিশ্ব যেখানে ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত সেখানে আমরা শুধু উন্নত বিশ্বের বর্জন করা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে ব্যস্ত অথচ মাত্র ১০ টা এগ্রো প্রোডাক্টের আগা-গোড়া গ্লোবালি সেল করে গার্মেন্টেসের চেয়েও বেশি রফতানি আয় করা সম্ভব।
আমরা বিলিয়ন ডলারের টমেটো, কাঁঠাল নষ্ট করে আশেপাশের দেশগুলো থেকে মিলিয়ন ডলারের টমেটো সস, পাওডার, কাঁঠাল পাউডার থেকে তৈরি করা বিভিন্ন বেবি ফুড, কাঠালের আটা ইত্যাদি ইমপোর্ট করছি।
ঢাকার বড় বড় মাছের আড়তে ৩০-৪০% ইন্ডিয়া থেকে ইমপোর্টেড মাছ বিক্রি হচ্ছে, রুই, মৃগেল, কাতল, বোয়াল, আইড়, কাকিলা, কাচকি সহ প্রায় সব ধরণের ফরমালিন যুক্ত ইন্ডিয়ান মাছ ঢাকার বাজার গুলোতে ভরপুর কিন্তু কেন? আমরা তো ২০১৫ সাল থেকেই মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের মাছ চাষিরা বছরের পর পর বছর লোকসানে আছে, গ্লোবাল মার্কেটে এই মাছগুলোর ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্বেও আমরা চাহিদামত বিক্রি করতে পারছি না, কারণ সেসব উন্নত দেশের টেস্টিং রিকুয়ারমেন্ট ফুলফিল করতে পারছি না, হেভি মেটাল সহ অনেক রকমের সমস্যা ধরা পড়ছে। তাদের পোর্টে গিয়ে কোন সমস্যা ধরা পরলে সেটা আবার আমাদের খরচেই ব্যাক নিয়ে আসতে হচ্ছে / সেখানে নষ্ট করে দিতে হচ্ছে অথচ আমাদের পোর্টগুলো কতইনা সস্তা, মাত্র ২-৪ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে হাজারো সমস্যাযুক্ত বিদেশি পণ্য আমাদের পোর্ট অফিসাররা দেশে ঢুকতে দিচ্ছে।
উন্নত বিশ্বের টেস্টিং রিকুয়ারমেন্ট ফিলাপ করার মত আমাদের গ্লোবাল মানের সরকারি কোন ল্যাব নেই, বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের টেস্ট ইউরোপ-আমেরিকা এক্সেপ্ট করে না, ছিড়ে ফেলে। তরুন উদ্যোক্তারা তো আর হাজার হাজার ডলার দিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে টেস্ট করাতে পারবে না, আর এসব সমস্যার কারণেই তরুণ উদ্যোক্তারা থেমে যাচ্ছে, নতুন নতুন ইনোভেটিভ পণ্য গ্লোবাল মার্কেটে বাংলাদেশ থেকে লিস্টেড হচ্ছে না।
নতুন উদ্যোক্তাদের পণ্যগুলো সম্পূর্ণ ফ্রিতে গ্লোবাল মানের টেস্টিংয়ের জন্য বিএসটিআই ও বিসিএসআইআর কে কবর দিয়ে আবার নতুন করে জন্ম দিয়ে "জেন জি"দের হাতে দায়িত্ব দিলে বাংলাদেশ এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে।
আমরা তরুণ উদ্যোক্তারা সবাই এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন হলে আমাদের আমদানি ব্যায়ের তুলনায় রফতানি আয় বাড়বে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন নতুন ব্যাবসা দ্বারা বেকারত্ব দূরীকরণে এক আমূল-পরিবর্তন আসবে ইনশাআল্লাহ।
Collected..
Highlights Bangladesh